

গল্পের নাম: “তোমার জন্য”
লেখক:এস এম ইলিয়াস
অধ্যায় ১: নিষিদ্ধ ভালোবাসা
স্বপ্নীল একজন দরিদ্র কৃষকের ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন খামারে কাজ করে সংসারে সাহায্য করে। আর ছোয়া এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, শহরের একটি মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্রী।
একদিন ছোয়ার ছোট ভাইকে পড়াতে গিয়ে স্বপ্নীলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয় গড়ায় বন্ধুত্বে, আর সেই বন্ধুত্বের আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক নিঃশব্দ, গভীর ভালোবাসা।
ছোয়া স্বপ্নীলের সাদাসিধে জীবন, তার সহানুভূতিশীল মন, আর একরোখা ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সমাজ আর পরিবার এই সম্পর্ককে সহজে মেনে নিতে রাজি নয়।
যখন ছোয়ার বাবা ও বড় ভাই এই সম্পর্কের কথা জানতে পারে, তখন শুরু হয় নিষেধ, হুমকি, অপমান। তাদের চোখে স্বপ্নীলের দরিদ্র পরিচয় একটা ‘দাগ’ — যা মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে।
অধ্যায় ২: পালিয়ে যাওয়া
একদিন ছোয়ার বিয়ে ঠিক করে ফেলে তার পরিবার। এই খবর শুনে ছোয়া আর নিজেকে আটকাতে পারে না। সে স্বপ্নীলকে ডেকে নিয়ে বলে,
“তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। চলো, পালিয়ে যাই। তোমার হাতটা ধরেই আমি বাঁচতে চাই।”
স্বপ্নীল দোটানায় পড়ে যায়। তার নেই স্থায়ী কোনো কাজ, নেই নিজের ঘর বা স্বচ্ছলতা। কিন্তু ছোয়ার চোখের জল আর ভালোবাসায় ডুবে থাকা কণ্ঠস্বরে সে সাহস পায়।
তারা পালিয়ে যায় শহরের এক কোণে ভাঙাচোরা একটা বাসায়। ছোয়া কিছু সামান্য টাকা সঙ্গে আনে। ভালোবাসা তখনও তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্বল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভাব বড় বাস্তব হয়ে ওঠে।
অধ্যায় ৩: অবহেলার ভিতর ভালোবাসা
দিন যায়, টাকা শেষ হতে থাকে। স্বপ্নীল কাজ খুঁজেও কিছু জোগাড় করতে পারে না। প্রতিদিন এক চিলতে ভাত, ডাল আর বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে তাদের।
স্বপ্নীল কাঁদে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেকে দোষ দিতে থাকে। এক রাতে এক বন্ধুকে বলে,
“আমি তো কিছুই ছিলাম না। শুধু ভালোবেসে ওকে নিয়ে এসেছি। এখন ছোয়া আমার সঙ্গে কষ্টে আছে। হয়তো এখন ও সুখে থাকত, আমি কি ওর জীবনটাই নষ্ট করলাম?”
অধ্যায় ৪: ছোয়ার প্রত্যুত্তর
সেদিন রাতে স্বপ্নীল চুপচাপ বসে থাকে, খায় না কিছু। ছোয়া আসে, তার হাত ধরে বলে,
“তুমি ভাবো না, আমি কষ্টে আছি? স্বপ্নীল, আমি এখন ভালো আছি।
তোমার হাতটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। রিক্সা থাক বা না থাক, রাজত্ব তো তুমি করছো আমার হৃদয়ে।
তুমি রাজপুত্র নাও হতে পারো, কিন্তু আমার কাছে তুমিই রাজা।
তুমি আমাকে সম্মান করো, ভালোবাসো — এটাই আমার সুখ।”
স্বপ্নীলের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে বলে,
“আমি রিক্সা চালাবো, মাটি কাটবো, দিনমজুরিও করবো — কিন্তু তোমার মুখে আর কষ্ট আসতে দেব না।”
অধ্যায় ৫: নতুন শুরু
স্বপ্নীল রিক্সা চালানো শুরু করে। ছোয়া বাসায় টিউশন পড়ায়। অভাব রয়ে যায়, কিন্তু সেই সাথে আসে মানসিক শান্তি।
একদিন স্বপ্নীল ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে দেখে ছোয়া নিজে হাতে রান্না করেছে ডাল, ভাত আর ডিম। প্লেট এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলে,
“খাও রাজা বাবু, আজ তোমার রান্না আমার হাতে।”
স্বপ্নীল হাসে, বলে,
“ভবিষ্যতে যদি কিছু হতে পারি, আমি চাই তুমি ডাক্তার হও। আমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।”
ছোয়া মৃদু হেসে বলে,
“আমার স্বপ্ন? আমি তো এখনই স্বপ্নের মধ্যে আছি — তুমি আর আমি, একসাথে।”
শেষ দৃশ্য
দুজন খোলা ছাদে বসে আকাশের তারা দেখে।
স্বপ্নীল বলে,
“ভালোবাসা কি শুধু সুখের সময় পাশে থাকা?”
ছোয়া বলে,
“না, ভালোবাসা মানে কষ্টের সময়ও একসাথে থাকা। হাসা-কাঁদা, না খেয়ে থাকা, কিন্তু একে অপরকে ভালোবাসা থেকে সরতে না পারা।”
দূরে আজানের ধ্বনি শোনা যায়। নতুন একটা ভোর যেন অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।
তারা জানে না ভবিষ্যতে কী আছে, কিন্তু তারা এটুকু জানে — তারা একে অপরকে পেয়েছে।
শেষ কথা
এই গল্প আমাদের শেখায়:
ভালোবাসা মানে শুধু স্বপ্নের জীবন নয়, বরং ত্যাগ, সম্মান আর একে অপরের পাশে থেকে জীবনকে গড়ে তোলা। সমাজের বাধা যখন ভালোবাসার পরীক্ষা নেয়, তখনই বোঝা যায় — কে সত্যিকারের ভালোবাসে।
স্বপ্নীল আর ছোয়া হারায়নি, কারণ তারা নিজেদের ভালোবাসায় জয়ী হয়েছে।