

গল্প: “ইলিয়াস – সংগ্রামের বিজয়”
ইলিয়াস, হাজিপুর বউবাজারের একটি ছোট্ট গ্রামের ছেলে। তার জীবন ছিল অন্যদের মতো সহজ ছিল না। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। খাওয়ার জন্য যখনই কষ্ট পেতে হত, তখনই ইলিয়াসের মনে এক নতুন স্বপ্নের জন্ম হতো। সে ভাবত, “একদিন আমি কিছু হব, কিছু করতে পারব, আমার মা-বাবাকে এই কষ্টের জীবন থেকে বের করে আনব।”
ছোটবেলায়, ইলিয়াসের সবচেয়ে বড় শখ ছিল আঁকাআঁকি করা। কিন্তু তার গরিব পরিবার তাকে কখনোই আঁকা শেখার সুযোগ দেয়নি। খাতা বা কলম কেনার টাকা ছিল না, আর আঁকা করার জন্য তাই মাটির মধ্যে, দেয়ালের কোণে, গাছের পাতা এবং কয়লা দিয়ে আঁকতো সে। বাড়ির পাশে একটা পুরনো দেয়ালে, গাছের পাতার শাখায়, মাটির ওপর আঁকা ছবি তার সঙ্গী ছিল। তবে, তার পরিবারের সদস্যরা বুঝত না, কেন সে এইসব করে। তার বাবা-মা মনে করতেন, “এগুলো কোনো কাজে আসবে না, পড়াশোনা করো, আঁকা দিয়ে কি হবে?”
বেশিরভাগ সময়ই ইলিয়াসকে এই কারণে মারধর করা হতো। মা-বাবা বলতেন, “খাতা কলমের মধ্যে আঁকতে হলে টাকা লাগবে, আর আমরা তা কোথা থেকে পাবো?”
কিন্তু ইলিয়াস থেমে থাকেনি। সে জানতো, এ আঁকাআঁকির মধ্যে কোনো শক্তি আছে। একদিন স্কুলের ম্যাডাম তার আঁকা ছবিগুলো দেখে মুগ্ধ হলেন। ম্যাডাম বললেন, “তুমি তো অদ্ভুত সুন্দর আঁকতে পারো, তোমাকে একটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তুমি দেখাতে পারবে যে, তোমার মধ্যে এক বিশেষ প্রতিভা আছে।”
তবে প্রথমে ইলিয়াস খুবই দ্বিধায় ছিল। সে জানতো, তার মতো গরিব ছেলে শহরের বড়লোক ছেলেমেয়েদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গেলে তার কাছে কোনো ভালো উপকরণ থাকবে না। তার কাছে ছিল একটি সস্তা পেন্সিল এবং এক টুকরা আর্ট পেপার। কিন্তু ম্যাডাম তার প্রতি আস্থা রাখলেন, এবং তাকে উৎসাহ দিলেন। ইলিয়াসের মা, যে নিজের ছেলের আঁকার দিকে একদম উদাসীন ছিল, তিনি তার স্কুলের ম্যাডামের কথা শুনে বললেন, “আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি যেহেতু ভালো করতে পারো, তাহলে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করো। আমি তোমার পাশে আছি।”
এভাবে, ইলিয়াসের মা প্রথমবারের মতো তাকে সাহস দিলেন। তিনি জানতেন, টাকা-পয়সা না থাকলেও তার ছেলে যদি সত্যিই কিছু করতে পারে, তাহলে সবার চোখে সে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে।
প্রতিযোগিতার দিন, শহরের বড়লোক ছেলে-মেয়েরা তাদের দামি রং পেন্সিল, রঙিন কাগজ নিয়ে প্রস্তুত ছিল। ইলিয়াসের কাছে কিছুই ছিল না—শুধু একটি পেন্সিল, একটি আর্ট পেপার, আর অনেক আশা। সে নিজে শঙ্কিত ছিল, “এত বড়লোক ছেলেমেয়েরা, তাদের কাছে এত ভাল উপকরণ, আর আমি কী করব এই সামান্য পেন্সিল দিয়ে?”
তবুও, সাহস নিয়ে সে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করল। শহরে প্রথমবারের মতো, বিদেশি বিচারকরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশ থেকে এসেছিলেন। ইলিয়াসের জন্য সেই মুহূর্ত ছিল একেবারে নতুন, এবং বিদেশিদের সামনে আঁকতে ভয় পাচ্ছিল।
পুরস্কারের ঘোষণার সময়ে, তার মন অনেকটা ভেঙে গিয়েছিল। সে ভাবছিল, “আজকের বিজয় কার হাতে যাবে?” তার মনে হচ্ছিল, সে কখনোই সফল হতে পারবে না। কিন্তু তার মনের ভেতরে এক শক্তি ছিল, যে শক্তি তাকে তাগিদ দিচ্ছিল এগিয়ে যেতে।
শেষে, যখন পুরস্কারের ঘোষণা হলো, তখন সবাই অবাক হয়ে গেল। ইলিয়াসের নাম ঘোষণা করা হলো। তার চোখে পানি চলে এলো, কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। এই ছিল তার জীবনের প্রথম বড় বিজয়। তার মা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন, এবং তার মুখে ছিল এক অজস্র গর্ব আর আনন্দের ঝিলিক।
মা বললেন, “আমি জানতাম, তুমি একদিন এই জয় পাবে। তুমি যদি চেষ্টা করো, তাহলে কিছু না কিছু পাওয়া সম্ভব।”
এই বিজয়ের পর, ইলিয়াসের মনের মধ্যে এক নতুন উজ্জ্বলতা সৃষ্টি হলো। তার জীবন আরও নতুনভাবে শুরু হল। সে জানত, এই বিজয় ছিল তার পরিবারের জন্য, তার গ্রামের জন্য, এবং তার জন্য যারা বিশ্বাস করেছিল, কিন্তু সেই বিশ্বাসের পথে চলতে তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
ইলিয়াসের সংগ্রাম এখনো থামেনি, কিন্তু সে জানতো—প্রতিটি সংগ্রামই তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, এবং তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এস এম ইলিয়াস। অফিস : নরসিংদী, হাজিপুর বউবাজার, নরসিংদী-১৬০০। যোগাযোগের ঠিকানা-হাজিপুর বউবাজার, নরসিংদী সদর নরসিংদী মোবাইল: ০১৭৬৪৯৫১৭৫১ ( সম্পাদক), ০১৯৪৪১৭৮৪৭
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫