

“নির্দোষের অপবাদ”
স্বপ্নীল : এক নাট্যপ্রেমীর বেদনাময় যাত্রা
ছেলেটির নাম স্বপ্নীল। নামের মতোই তার চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন—মঞ্চ, ক্যামেরা, আলো, আর মানুষের ভালোবাসায় গড়ে তোলা এক রঙিন দুনিয়া। স্থানীয়ভাবে নাটক করতেন, কিছু নাটক ইউটিউবেও প্রকাশ পেত। নাট্যচর্চা ছিল তার প্রাণ। নিজের পকেটের টাকায়, নিজের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক নাট্যদল। কিন্তু দরকার ছিল একজন নায়িকার, একজন সহযাত্রী যার সঙ্গে মিলে স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নিতে পারত।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর শান্তা নামের এক মেয়েকে পেয়ে নাটক তৈরি করলেন স্বপ্নীল। অল্পদিনে সেই নাটক স্থানীয় চ্যানেলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ সেলফি চাইতো, রাস্তায় হাত মেলাতো, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতো—এই অনুপ্রেরণাই ছিল স্বপ্নীলের পাথেয়। একের পর এক নাটক বানাতে থাকেন তিনি, বিভিন্ন মেয়েদের নিয়ে। কিন্তু মেয়েরা বেশিক্ষণ থাকতে পারত না। কখনো পরিবার, কখনো প্রেমিক, কখনো সমাজ—সবই বাধা হয়ে দাঁড়াতো।
তবুও থামেননি স্বপ্নীল। অভিনয় ছিল তার শিরায় শিরায়। একদিন একটি মেয়ে, ময়না, তার জীবনে আসে নাটকের সূত্রে। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পায় বিয়েতে। সুখের সংসার গড়ে ওঠে। সন্তান আসে তাদের জীবনে। স্বপ্নীল হয়ে ওঠে একজন দায়িত্ববান স্বামী, একজন স্নেহশীল বাবা।
স্বপ্নীলের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল—সে মেয়েদের শ্রদ্ধা করত। কাজ শেষে নিজে বা লোক মারফত বাড়ি পৌঁছে দিতো। কেউ যদি মেয়েদের সঙ্গে বাজে আচরণ করত, সঙ্গে সঙ্গে তাকে দল থেকে বের করে দিত। নাট্যদলে মেয়েরা তার সম্মানে নিরাপদ বোধ করতো।
কিন্তু এই নিরাপত্তাই একদিন কাল হয়ে দাঁড়ায়।
নিঝুম নামে এক নতুন অভিনেত্রী দলে যোগ দেয়। কিছু নাটকে অভিনয় করে সে স্বপ্নীলের প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু এখানেই জন্ম নেয় সন্দেহ। স্বপ্নীলের স্ত্রী ময়না তাকে ভুল বোঝে। এরপর আসেন মুন্নি। মুন্নি ও স্বপ্নীলের জুটি হয়ে ওঠে নরসিংদীর প্রাণ। একসঙ্গে ২০টির বেশি নাটক করেন তারা।
তবে, মুন্নিকে চুপিচুপি পছন্দ করতেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। স্বপ্নীলের সান্নিধ্য তার সহ্য হয়নি। সে ষড়যন্ত্র করে স্বপ্নীলকে নিয়ে ময়নার কানে নানা কুৎসা দিতে থাকে। স্বপ্নীলের বিরুদ্ধে দানা বাঁধে সন্দেহ, অবিশ্বাস, অপবাদ। ময়না ও তার পরিবার মুন্নিকে হুমকি দিতে থাকে। অবশেষে মুন্নি ও তার পরিবার নাটক ছেড়ে দেয়। স্বপ্নীলের স্বপ্ন যেন একেক করে ভেঙে পড়ে।
তবুও হার মানেননি স্বপ্নীল। তিনি জেদ করে বলেন, “আমি মুন্নির সাথেই কাজ করব, আমি জানি আমি নির্দোষ।” কিন্তু সেই জেদই একদিন আগুনে পরিণত হয়। নানা অপবাদে জর্জরিত হয়ে, অবশেষে স্বপ্নীল নরসিংদী ছেড়ে চলে যান ঢাকায়। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে পেছনে ফেলে যান তার ছেলেবেলার শহর, ভালোবাসার মঞ্চ, এমনকি ময়নাকেও।
ঢাকায় গিয়েও শান্তি মেলে না। একসময় মুন্নিও তাকে সন্দেহ করতে থাকে। হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায় স্বপ্নীলের। অবশেষে সব কিছু ছেড়ে, এক নতুন মেয়েকে বিয়ে করেন। তার সঙ্গে গড়ে ওঠে নতুন সংসার, যেখানে স্বপ্নীল হয়তো ভালো নেই, কিন্তু চেষ্টা করছেন সুখে থাকতে।
আর এদিকে, ময়না চার বছর অপেক্ষা করে, তারপর অন্য কাউকে বিয়ে করে নেন।
শেষ কথাটি
স্বপ্নীল ভালোবাসা চেয়েছিল, মানুষকে বিনোদন দিতে চেয়েছিল। সে শুধু চেয়েছিল একটা ভালো নাটক তৈরি হোক, মানুষ হাসুক, কাঁদুক, ভাবুক। কিন্তু ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সমাজের চোখ—এই তিনটির লড়াইয়ে বারবার হারতে হয়েছিল তাকে।
তার জীবনটা একটা অসমাপ্ত নাটকের মতো—যার শেষ দৃশ্যে পর্দা নামে, কিন্তু হৃদয়ে রয়ে যায় অপূর্ণতার হাহাকার।
এই গল্পটি শুধুমাত্র এক নাট্যপ্রেমী স্বপ্নীলের নয়, এটা তাদেরও গল্প, যারা ভালোবাসে কিন্তু বুঝিয়ে উঠতে পারে না। যারা সত্যি নিষ্পাপ, তবু অভিযোগের তীর ছুঁড়ে দেয়া হয় তাদের দিকেই।
🥀