

গল্প: “একটি ভুলের শাস্তি”
লেখক: এস. এম. ইলিয়াস
একটা মুহূর্ত। একটা মাথা গরম।
আর ঠিক তখনই — জীবনের চাকা ঘুরে গেল উল্টোমুখে।
আমি জানতাম না, সেই ছোট্ট ভুলটা আমাকে ছিঁড়ে ফেলে নিয়ে যাবে একটা অন্ধকার বন্দিশালার দিকে।
পেছনে ফেলে এলাম আমার মা, আমার বউ, আমার ছোট্ট সন্তান…
তাদের কান্না, তাদের অসহায় দৃষ্টি—সব পেছনে।
পুলিশের হাতের মধ্যে যখন আমার হাতটা আটকে গেল, তখন বুঝলাম না—এটা স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন।
জীবনে প্রথমবার, আমি যাচ্ছি জেলখানায়।
প্রথম রাতটা মনে হয়েছিল, এই বুঝি পাথর গায়ে চেপে বসেছে।
ঘরটা যেন নিশ্বাস ফেলতে দেয় না। পাশেই অপরিচিত শরীর গা ঘেঁষে শুয়ে আছে।
ঘুম বলে কিছু নেই। চোখের পাতা ভেজা।
সকালে ডাকে এক অমানবিক গলা—
“উঠ! জেলার ফাইল নিতে যা!”
পেছনে একটু দেরি মানেই—একটা বেতের আঘাত।
নাম ধরে ডাকলেই বুঝি কেউ ভুল করেছে।
আর সেই ভুলের শাস্তি শুরু হয় চামড়া ফেটে যাওয়া অবধি।
খাবার? পাতলা ভাত, কচু পাতার মতো ডাল।
তাও লাইন ধরে, গালাগালি শুনে, কখনও লাথি খেয়ে নিতে হয়।
সকালের খাবার, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার—তিনটে একই রকম বিষ।
তবুও খেতে হয়, না খেলে বেঁচে থাকা যায় না।
আর রাতে?
একজনের গায়ে একজন গিয়ে পড়ে।
ঘুমের চেয়ে ঘেমে ওঠা শরীরের গন্ধ বেশি টের পাওয়া যায়।
জেলের ভিতর একটা জিনিস খুব স্পষ্ট—
টাকা থাকলে তুমি রাজা।
বাইরের থেকে ভালো খাওয়া, ভালো জামাকাপড়, ফোনে দিনের পর দিন কথা—সবই পাওয়া যায়।
আর টাকা না থাকলে?
তুমি কেবল একটা সংখ্যা।
তোমার জন্য শুধু ঘাম, কান্না আর অপেক্ষা।
আমি বসে থাকি কোণার একটুকরো জায়গায়।
আকাশটা দেখি, ওপরে একফালি নীল।
ভেবে ভেবে বুক ফেটে যায়—
আমার মা এখন কাঁদছে? আমার সন্তান কি খেতে পাচ্ছে? আমার বউ আমাকে ছাড়া কীভাবে বাঁচছে?
দিন যায়, মাস যায়।
কেউ ছাড়া পায়, কেউ নতুন আসে।
নতুন মুখগুলো দেখে বোঝা যায়, তাদের জীবনের আলোটুকুও নিভে গেছে।
তাদের চোখে জল, ঠোঁটে কথা—
“আমি তো কিছু করিনি ভাই, কেন এলাম এখানে?”
কেউ একজন কোরান পড়ছে, কেউ গান ধরেছে, কেউ নামাজে মাথা ঠেকাচ্ছে,
আবার কেউ বসে গল্প করছে—
“বাইরে গিয়ে কাকে মারবে, কিভাবে কাজ শেষ করবে।”
একদিন এক বৃদ্ধ এলো। তার শরীরটা কাঁপছে।
তাকে কেউ লাঠি ছাড়াই টানতে পারল না।
সে বলল,
“আমার ছেলে বাড়িতে বসে কাঁদে, আমি তার সঙ্গে শুধু একবার দেখা করতে চাই।”
এই জায়গাটাকে জেলখানা বলে না, বলে এক পাগলের কারখানা।
যেখানে মানুষ ক্রমে মানুষ থেকে পাথর হয়ে যায়।
আমি ভুল করেছিলাম। স্বীকার করি।
কিন্তু এই শাস্তি শুধু আমাকেই নয়, আমার গোটা পরিবারকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।
আমার মা, আমার বউ, আমার সন্তান—তারা কি আমার চেয়েও বড় সাজা পাচ্ছে না?
একটা ভুল, একটা মাত্র ভুল,
সেই ভুলের চিহ্ন নিয়ে আজ আমি এখানে।
আমি শুধু মুক্তি চাই না, আমি শুধু ফিরে যেতে চাই
সেই জায়গায় যেখানে ভালোবাসা আছে, মায়া আছে, শান্তি আছে।
এই অভিজ্ঞতা কাউকে যেন না হয়।
জেলখানা কেবল লোহার গেট আর তালা নয়—
এটা একটা বধ্যভূমি, যেখানে মানুষ একটু একটু করে মরে যায়।
—
শেষকথা:
ভুল মানুষের জীবন নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা—
ভুল স্বীকার করে কেউ যদি ফিরে আসতে চায়,
তবে সমাজ কি তাকে সুযোগ দেবে?
—
লেখক: এস. এম. ইলিয়াস
(একজন বন্দীর চোখে দেখা বাস্তবতার নির্মম চিত্র)
—