

ইলিয়াস ও মহিমার দাম্পত্য জীবনের ছয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। বহুদিন ধরেই মহিমা বলছিল, “চলো একবার আমার বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।” তবে নানা ব্যস্ততার কারণে সেই সফর আর করা হয়ে উঠছিল না। তবুও মহিমা থামেনি, অপেক্ষায় ছিল – হয়তো একদিন ইলিয়াস রাজি হবেন।
অবশেষে বহু অনুরোধে একদিন ইলিয়াস বলেই ফেললেন, “চলো, এবার যাই তোমার বাবার বাড়ি।” এই কথাটা যেন সবার মুখে হাসি ফোটায়। মহিমার বাবা আনোয়ার শাহাদাত শিশির, যিনি নোয়াখালীতে থাকেন স্ত্রী ও চার মেয়েকে নিয়ে—শুনে অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে উঠলেন। মহিমার তিন বোন—মম, মুনিয়া ও মুনতাহা—তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
ইলিয়াস, তার স্ত্রী মহিমা, এবং তাদের ছোট্ট সন্তান নিশানকে নিয়ে রওনা দিলেন নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে। স্টেশনের গেটের সামনে যখন আনোয়ার সাহেব তাদের দেখে ফেললেন, তার চোখে-মুখে যেন শান্তির ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল। এতদিনের অপেক্ষার পর পরিবারকে দেখে যেন হৃদয়ের ভার হালকা হয়ে গেল।
দু’টি অটো রিকশা করে সবাই পৌঁছে গেল বাড়িতে। মহিমার মা ও তিন বোন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল ইলিয়াস ও মহিমাকে। হাসি, আনন্দ, চোখের জল—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো।
পরদিন থেকে চলল একের পর এক আনন্দ-উৎসব। একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া, গল্পগুজব, ফাজলামি, হাসাহাসি। ইলিয়াসের সঙ্গে মুনিয়ার দুষ্টুমিগুলো যেন নতুন মাত্রা এনে দিল। ইলিয়াস যেন হয়ে উঠেছিল পরিবারের আরেক আপন সদস্য, শুধু জামাই নয়—একজন ভাই, বন্ধু, আর সবার প্রিয়জন।
আনোয়ার সাহেব বাজার থেকে নিজের হাতে চাল, মাছ-মাংস, সবকিছু নিয়ে এলেন। বিকেল হলেই সবাইকে ডেকে নিয়ে যেতেন তার দোকানে—নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মোদির দোকানে। সেখানেও নিজ হাতে বানানো নুডলস, সিন্নি আর মুখরোচক খাবার পরিবেশন করতেন। ছবি তোলাও ছিল তাঁর আরেক শখ—একসাথে অনেক ছবি তোলা হতো, হাসির ফোয়ারা চলতো অবিরত।
প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল মুহূর্তের মধ্যেই। কেউ বুঝতেই পারল না সময় এত দ্রুত চলে গেল কীভাবে। এই ক’দিনে একসাথে গোসল, পুকুরে মজা, পার্কে ঘুরে বেড়ানো—সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের মতো এক টুকরো স্মৃতি হয়ে উঠলো এই সফর।
তবে আনন্দের মাঝেও এক বিষাদ ছিল—সাত তারিখের টিকিট। যাওয়ার দিন যতই ঘনিয়ে এলো, ততই ম্লান হতে লাগল সবার মুখের হাসি। বিদায়ের আগের দিন মুনিয়া, মম, মুনতাহা আর মহিমার মা—সবাই চুপচাপ, কারো মুখে স্বাভাবিক হাসি নেই। কেউ খাচ্ছে না, কেউ কান্না লুকোচ্ছে।
পরদিন ভোর। সবাই জেগে উঠল, প্রস্তুতি নিল নরসিংদী ফেরার। বিদায়ের মুহূর্ত যেন স্তব্ধ করে দিল পুরো বাড়িকে। মুনিয়া-মম মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে, চোখ টলমল করছে। মহিমার বাবা মুখে কিছু না বললেও বোঝা যাচ্ছিল, বুকের ভেতর কোথাও ফাটছে কিছু একটা।
স্টেশনে এসে ইলিয়াস ও তার পরিবারকে ট্রেনের সিটে বসিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে হঠাৎ চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে যেন জীবনের সব ভালোবাসা, কষ্ট আর স্মৃতি এক মুহূর্তে উথলে উঠল। মেয়ে চেয়ে রইল বাবার দিকে, আর বাবা তাকিয়ে রইলেন প্রিয় কন্যার দিকে—চোখের ভাষা বলে দিল সবটুকু।
নরসিংদীতে পৌঁছানোর পর ফোনে যখন কথা হলো, সবাই কাঁদছিল। ঘরটা নাকি একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ইলিয়াস ফোন দিল মুনিয়া, মম, মহিমার মা—সবাই বলছে, ভালো লাগছে না। মুনিয়া বলল, “দুলাভাই, আপনারা আসছিলেন বলে ঘরটা কেমন আলো হয়ে উঠছিল, আর এখন কেমন নিঃস্ব লাগতেছে।”
রাতে হঠাৎ মহিমার বাবার ফোন। মহিমা ঘুমিয়ে ছিল। ফোন ধরতেই সেই কান্না-ভেজা কণ্ঠ, “আর ক’দিন থেকে গেলে হইতো না? ঘরটা খালি লাগতেছে মা। ঘরটা আসলে তোমাদের ছাড়া একদম ফাঁকা।”
মোবাইলটা ইলিয়াসের হাতে দিল মহিমা। তিনি শুধু একটা কথাই বললেন, “আমার খুব খারাপ লাগতেছে।” তারপর আর কিছু বলতে পারলেন না। ফোনের ও পাশ থেকে কান্নার আওয়াজই শুধু শুনতে পাওয়া গেল।
—
শেষ কথা
বিদায়ের মুহূর্ত সবসময়ই কষ্টদায়ক। তবে ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, সে বিদায়ও একদিন হবে আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি। এই সফর যেমন অনেক আনন্দের, তেমনি হৃদয় ভেঙে দেয়া এক স্মৃতিময় ভালোবাসার গল্প।