

🟩 স্বপ্নীল ও ছোঁয়ার ভালোবাসা
লেখক: এস. এম. ইলিয়াস
⸻
অধ্যায় ১: সেই সন্ধ্যাবেলার প্রথম দেখা
স্বপ্নীল একদিন চাচার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল কোনও একটা কাজের সূত্র ধরে। সময়টা ছিল সন্ধ্যা। ঘরে প্রবেশ করতেই, একটা দৃশ্য যেন সময়কে থামিয়ে দিল। এক অচেনা মেয়ের চোখে চোখ পড়ে গেল তার।
স্বপ্নীল আগে কখনো কোনও মেয়ের দিকে এভাবে তাকায়নি।
মেয়েটি ছিল দারুণ কিউট, অসাধারণ সুন্দর।
সে তখনও জানতো না কে এই মেয়ে। একটু পর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে পরিচয় শুরু হলো।
কেউ একজন বলল,
— “স্বপ্নীল, ও ছোঁয়া। তোমার কাকার মেয়ে।”
এই নামটা শুনে স্বপ্নীল অবাক হয়ে খেয়াল করলো— এ তো সেই ছোটবেলার ছোঁয়া!
আজ সে এতটা বড় হয়ে গেছে, এতটা মোহময়ী রূপে ফিরেছে— যেন বাস্তব নয়।
ছোঁয়া তখন থেকেই একটানা মুচকি হাসি দিয়ে তাকিয়ে ছিল স্বপ্নীলের দিকে।
সে আগেই জানতো, স্বপ্নীল তাদের বাড়িতে আসবে।
স্বপ্নীলের দাদি মানে ছোঁয়ার দাদিও বলেছিল,
— “আমার নাতি খুব ভালো ছেলে। মেধাবী, আর সবাই তার প্রশংসা করে।”
এমন একজন পছন্দের নাতিকে ঘিরে পুরো বাড়ি তখন যেন উৎসবমুখর।
রাতের খাবার সময় সবাই একসঙ্গে বসলো। ছোঁয়া যেন চোখ ফেরাতে পারছিল না।
স্বপ্নীল সেটা লক্ষ করল। ভাবল,
— “এই মেয়ে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে কেন? আর মুচকি মুচকি হাসছে… কিছু একটা আছে।”
খাওয়া শেষে, রাতের ঘুমানোর পালা।
সবাই বলল স্বপ্নীল খাটে ঘুমাবে, বাকি সবাই মাটিতে।
গ্রামের বাড়ি, একটাই খাট— তাই এটাই ছিল রীতি।
হঠাৎ স্বপ্নীল বলল,
— “আমার মাথাটা খুব ব্যথা করছে।”
এই শুনে ছোঁয়ার দাদি বললেন,
— “এই রে, কেউ আমার নাতির মাথায় একটু তেল মাখিয়ে দেয়। ওষুধ দে।”
ছোঁয়া তখন বলল,
— “আমি ভাইয়ার মাথায় তেল দেব, আর টিপে দেব।”
স্বপ্নীল মনে মনে হাসল।
— “আমি জানতাম, ও-ই বলবে।”
ছোঁয়া তখন ধীরে ধীরে তার মাথায় তেল মাখাতে লাগল।
নরম হাতের স্পর্শ, মিষ্টি হাসি, আর চোখে চোখে নীরব ভাষা—
সব মিলে একটা অনুভব:
এটাই কি প্রেম?
স্বপ্নীল ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
🟩 অধ্যায় ২: প্রথম মায়া, নদীপাড়, আর মিষ্টি দুষ্টুমি
সকাল হলো। গ্রামীণ পরিবেশের এক অপার সৌন্দর্য চোখে পড়ল স্বপ্নীলের।
নদীর ওপারে সূর্য লাল টমেটোর মতো উঠছে, পাখির ডাক, ধানক্ষেতের নরম বাতাস, আর মাটির পথ ধরে কৃষকের চলাফেরা— সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো।
স্বপ্নীল ঘর থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় ওয়াশরুমে যেতে হবে মনে হলো।
জিজ্ঞেস করতেই কেউ একজন ইশারা করে দিল—
— “ঐ যে ওদিকে।”
সে ধীরে ধীরে টিনের তৈরি সাদামাটা ওয়াশরুমের দিকে এগোল। সামনে দরজা ছিল একটা প্লাস্টিকের কাপড় দিয়ে ঢাকা।
স্বপ্নীল পানি নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই—
হঠাৎ দরজার ভেতর থেকে ছোঁয়ার চোখে চোখ পড়ে গেল!
আতঙ্কে দুজনেই কেঁপে উঠল।
স্বপ্নীল চোখ বন্ধ করে হঠাৎ একটু সরিয়ে এলো।
ছোঁয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠল—
— “আরে ভাইয়া, কী করলেন!”
স্বপ্নীল বলল,
— “আমি কী জানি তুমি ভেতরে! ইচ্ছে করে করিনি।”
ছোঁয়া বলল,
— “সমস্যা নাই, আপনি তো দেখেছেন, অন্য কেউ তো দেখে নাই।”
এই শুনে স্বপ্নীল তো অবাক—
— “এই কথা কেমন কথা! আমি দেখলে সমস্যা নাই?”
ছোঁয়া হেসে বলল,
— “ভাইয়া দাঁড়ান, আমি পানি এনে দিচ্ছি।”
সে পুকুর থেকে পানি এনে দিল, এবং স্বপ্নীল ওয়াশরুমে ঢুকল।
ভেতরে গিয়ে বারবার ঐ দৃশ্যটা মনে পড়ছিল, নিজের অজান্তেই হাসছিল।
ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার পর দেখে ছোঁয়া এখনও দাঁড়িয়ে।
— “কী ব্যাপার, গেলে না?”
— “না ভাইয়া, আমি আপনাকে নদীপাড় ঘুরিয়ে আনবো।”
দুজন মাটির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে এল।
প্রকৃতি তখন যেন প্রেমের পটভূমি সাজিয়ে রেখেছে।
ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে স্বপ্নীল আবার মজা করে বলল,
— “আজ যদি কেউ জানে আমি তোমাকে ওয়াশরুমে দেখছি, তখন তুমি কী করবে?”
ছোঁয়া হেসে বলল,
— “জানলে তো আপনি বললেই জানবে! আপনি বলবেন নাকি?”
— “না, বলবো না। কিন্তু তুমি কিছু মনে করোনি?”
— “না, প্রথমে একটু ভয় পাইছিলাম। কিন্তু আপনার মুখ দেখার পর মনে হল, সমস্যা নেই।”
— “তবে কি আগে কেউ দেখে নাই?”
— “আরে ভাই, আপনি কী বলেন! জীবনেও না!”
এই কথোপকথনে যেমন লজ্জা, তেমনি এক স্বচ্ছ মায়া—
যেখানে অনাবিল ভালোবাসার বীজ জন্ম নিচ্ছে।
ছোঁয়া জানতে চাইল,
— “ভাইয়া আপনি কী করেন?”
— “এইবার মেট্রিক পরীক্ষা দিব।”
— “আচ্ছা, চলেন তবে বাসায়। না হলে ওরা কিছু বলবে।”
দুজন আবার ফিরে এল। বিকেলে কানামাছি ভোঁ ভো, গ্রামীণ খেলা, আর ছোঁয়ার চোখে শুধু স্বপ্নীল।
খেলার অজুহাতে সারাক্ষণ দুজন একসঙ্গে থাকা।
সন্ধ্যা হয়ে এলো।
সেই রাত আবার ঘুমানোর পালা।
এইবার আবার এক মজার ঘটনা।
🟩 অধ্যায় ৩: ঘুমপাড়ানি রাতের গল্প
দুই দিন হয়ে গেছে স্বপ্নীল গ্রামে এসেছে। সবার ভালোবাসা আর খুশির আমেজ চারদিকে।
এইদিন রাতে ছোঁয়া ও তার ভাইবোনরা বলল—
— “আজকে আমরা ভাইয়ার সাথে একসাথে ঘুমাবো!”
ছোঁয়ার দাদি মজা করে বললেন,
— “কেন রে, আমার নাতির সাথে ঘুমাতে চাস নাকি?”
ছোঁয়া লজ্জায় বলল,
— “আরে দাদি, ভাইয়ার সাথে ঘুমালে কী হবে!”
সবাই হাসাহাসি করছিল।
এমন সময় দাদি বললেন,
— “আজকে আমি খাটে ঘুমাবো, নিচে ঘুমাতে পারতেছিনা।”
স্বপ্নীল বলল,
— “দাদি তুমি খাটে ঘুমাও, আমি নিচে শুয়ে পড়বো।”
এই কথা শুনে ছোঁয়ার যেন স্বপ্ন পূরণ হলো! কারণ আজকে স্বপ্নীল নিচে ঘুমাবে— মানে ছোঁয়ার কাছাকাছি থাকবে।
রাতের বেলায় সবার বিছানা পাতানো হলো। স্বপ্নীল শুয়ে আছে। তার পাশে এক চাচাতো ভাই শুয়ে পড়লো।
ছোঁয়ার যেন ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। কিছুতেই বলতে পারছে না—
“তুই একটু এদিকে যা, আমি ভাইয়ার পাশে শুই।”
স্বপ্নীল একটু বুঝতে পারছিল বিষয়টা, মুচকি মুচকি হাসছিল।
হঠাৎ চাচাতো ভাই বলল,
— “আমি প্রস্রাব করে আসি।”
এটাই সুযোগ!
ছোঁয়া চুপিসারে এসে স্বপ্নীলের পাশে ঘেঁষে শুয়ে পড়ল।
স্বপ্নীল বলল,
— “ঘুমাচ্ছো না কেন ছোঁয়া?”
ছোঁয়া বলল,
— “আপনার দিকে তাকাচ্ছি।”
— “তাকাও, আমি তো ঘুমাচ্ছি।”
— “ঠিক আছে।”
স্বপ্নীল চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে ছোঁয়ার চুল তার মুখে এসে পড়েছে।
আস্তে করে সরিয়ে দিল। ছোঁয়ার দিকে তাকাল— যেন এক মায়ার জালে বন্দি হয়ে গেছে।
সকাল হল।
স্বপ্নীল চোখ মেলেই দেখে— ছোঁয়া তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।
ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ছাড়িয়ে নিল। যদি কেউ দেখে ফেলে!
একটা লাজুক রোমান্টিক দৃশ্য — যার সাক্ষী শুধু ভোরের আলো।
🟩 অধ্যায় ৪: হারিকেনের কেরোসিন, অন্ধকার রাস্তা, ছোঁয়ার জড়িয়ে ধরা, আর প্রথম সাহসী স্পর্শ
⸻
রাতের খাবার শেষে সবাই বিশ্রামে।
হঠাৎ চাচিমা বললেন,
— “ছোঁয়া, হারিকেনের তেল শেষ। কেরোসিন আনতে হবে।”
ছোঁয়া বলল,
— “ঠিক আছে চাচি মা। ভাইয়া, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন?”
স্বপ্নীল একটু হেসে বলল,
— “চলো।”
সন্ধ্যার পর মাটির রাস্তা… চারদিক নিস্তব্ধ অন্ধকার।
মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে হাঁটছে দু’জন, পাশের ধানক্ষেতে মাঝে মাঝে কুকুরের ডেকে ওঠা — এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ।
স্বপ্নীল হঠাৎ ছোঁয়াকে ভয় দেখাতে একটা জোরে আওয়াজ করল—
“হুউউউউউউউ!”
ছোঁয়া চমকে গিয়ে এক ঝটকায় স্বপ্নীলকে জড়িয়ে ধরল!
তীব্র আবেগে, ভয়ে, হঠাৎ করে…
স্বপ্নীল হতবাক। জীবনে প্রথমবার— কোনো মেয়ে তাকে এমন করে জড়িয়ে ধরেছে।
— “আরে কিছু হয়নি! আমি তো শুধু মজা করছিলাম!”
— “এভাবে করবেন না, আমি খুব ভয় পাই,” ছোঁয়া বলল।
স্বপ্নীল হাসতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— “তুমি কি জানো, এই প্রথম কেউ আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরল?”
ছোঁয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— “আপনি সিনেমা দেখে দেখেন তাই বলছেন।”
তারা হেসে ফেলল দু’জনেই।
কেরোসিন নিয়ে ফিরে এল তারা। রাতটা কেটে গেল নিরবতায় — কিন্তু ছোঁয়ার স্পর্শ স্বপ্নীলের মনে গেঁথে গেল এক অব্যক্ত শিহরণ হয়ে।
🟩 অধ্যায় ৫: বিদায়ের সকাল, গাছতলায় অপেক্ষা, ছোঁয়ার চোখের জল, আর বুক চিরে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরা প্রেম
⸻
সকাল সকাল গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেঙে উঠে পড়ে স্বপ্নীল।
আজ তার ফিরে যাওয়ার দিন।
সে বাড়ির উঠোনে কাঁঠাল গাছের নিচে চুপ করে বসে আছে। মাথা নিচু, মন খারাপ।
ছোঁয়া ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে — স্বপ্নীল একা বসে আছে।
ধীরে ধীরে কাছে এসে বলল,
— “আজ তো চলে যাবেন, তাই না ভাইয়া?”
— “হ্যাঁ। আজ চলে যাচ্ছি…”
দু’জনের মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু চোখে কান্না, মুখে বিষণ্নতা।
ছোঁয়ার চোখের কোণ ভিজে, কিন্তু সে লুকাতে চাইছে।
— “আপনি আবার কবে আসবেন ভাইয়া?”
— “হয়তো এক বছর পর।”
ছোঁয়া স্তব্ধ। — “এতদিন… কেন ভাইয়া? তার আগেই তো আসতে পারেন।”
স্বপ্নীল বলল,
— “বাবা বিদেশে থাকেন, আমাদের যাওয়া আসা নির্ভর করে তার উপর।”
এই কথা বলার সময় পিছন থেকে ডাক এলো,
— “ভাইয়া, মা বলতেছেন রেডি হোন, গাড়ি আসতেছে।”
স্বপ্নীল উঠলো। বাড়ির সবাইকে বিদায় জানাতে গেল।
শেষে এল ছোঁয়ার সামনে।
দু’জন দাঁড়িয়ে রইল।
— “ভালো থেকো তুমি…”
— “আপনিও ভালো থাকবেন ভাইয়া…”
স্বপ্নীল হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে বারবার তাকাচ্ছে ছোঁয়ার দিকে।
আর ছোঁয়া দাঁড়িয়ে কাঁদছে। চিৎকার করছে না, কিন্তু চোখ বলছে সব।
হঠাৎই ছোঁয়া ছুটে এসে পেছন থেকে স্বপ্নীলকে জড়িয়ে ধরল!
চিৎকার করে বলল,
— “আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না ভাইয়া! আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি… আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি!”
স্বপ্নীল স্থির। চোখে জল। এক নিঃশ্বাসে বলল,
— “আমি আবার আসব। সত্যি বলছি। এটা কথা নয়, এটা আমার প্রতিজ্ঞা।”
ছোঁয়াকে দিল তার নাম্বার।
— “আমাকে যেকোনো নাম্বার থেকে মিসকল দিও, আমি ফোন করব।”
এই ছিল তাদের শেষ দেখা…
গাড়িতে বসে স্বপ্নীল বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল।
আর ছোঁয়া কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টি ছুঁড়ে দিচ্ছিল গাড়ির দিকে… যতক্ষণ চোখে পড়ে।
🟩 অধ্যায় ৬: এক বছরের অপেক্ষা, মিসকলের প্রতীক্ষা, আর হঠাৎ সেই কণ্ঠস্বর— “ভাইয়া, আমি ছোঁয়া”
⸻
স্বপ্নীল শহরে ফিরে গেল — কিন্তু মন পড়ে রইল সেই গ্রামে, সেই ছোঁয়ার কাছে।
দিন যায়, মাস যায়। ছোঁয়ার কোনো খোঁজ নেই।
স্বপ্নীল প্রতিদিন খালি চোখে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে — যদি একটা মিসকল আসে!
কিন্তু না, একটাও না।
বন্ধুদের আড্ডায়ও সে চুপচাপ, সবার চোখের আড়ালে নদীর ধারে বসে থাকে একা, যেন সেই ছোঁয়ার স্মৃতিগুলোকে বুকে জড়িয়ে।
এভাবে কেটে যায় পুরো এক বছর।
⸻
একদিন কোচিং সেন্টারে বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
হঠাৎ তার মোবাইলে একের পর এক তিনটা কল— অপরিচিত নম্বর থেকে।
স্বপ্নীল ব্যাক করল।
— “হ্যালো… আপনি কে?”
একটা মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল,
— “আমি ছোঁয়া ভাইয়া…”
পুরো পৃথিবী থেমে গেল স্বপ্নীলের কাছে।
চারপাশ যেন এক নিমিষে নিস্তব্ধ!
— “তুমি ছোঁয়া? সত্যি?”
— “হ্যাঁ ভাইয়া, আমি ছোঁয়া।”
স্বপ্নীল চোখে জল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “এতদিন পর মনে হল আমার কথা?”
— “ভাইয়া, আমি আপনাকে ভুলিনি… প্রতিদিন মনে করেছি। কিন্তু সাহস পাইনি ফোন দিতে। আমার বাসায় ফোন ছিল না। আর আমি চাইনি আপনার পড়াশোনায় সমস্যা হোক।”
স্বপ্নীল এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সবার আড়াল করে নির্জনে চলে গেল, আর ফোনটা ধরে বসে থাকল — যেন সেই কণ্ঠটা হারিয়ে না যায়।
— “তুমি এখন কোথায় ছোঁয়া?”
— “আমি বিক্রমপুরে। নানীর বাড়িতে থাকি। বাবার সঙ্গে এসেছি। এখানে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছি, এখন ক্লাস টেন। আপনি?”
— “আমি কলেজে উঠেছি। কিন্তু এখনো তোমার সেই কেরোসিনের রাতে জড়িয়ে ধরা স্পর্শ ভুলিনি…”
ছোঁয়া এক নিঃশ্বাসে বলল,
— “আপনাকে যে আমি ভালোবাসি, তা ভুলিনি ভাইয়া।
কিন্তু আমি চাইনি আমাদের সম্পর্কটা তাড়াহুড়ো করে নষ্ট হোক। আমি চাই ভালোভাবে পড়ালেখা শেষ করি। তারপর আপনাকে শুধু ভালোবাসি না, আপনাকে বিয়ে করব। এটাই আমার স্বপ্ন।”
স্বপ্নীল স্তব্ধ হয়ে যায়।
এই ছোট মেয়েটার ভিতরে এতটা দায়িত্ববোধ, ত্যাগ আর ভালোবাসা!
তার বুকের ভিতর কান্না জমে ওঠে।
— “তুমি আমাকে ধোকা দাওনি ছোঁয়া, তুমি আমাকে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছো— অপেক্ষা করার শিক্ষা।”
⸻
তারা সিদ্ধান্ত নেয়— মোবাইলে কথা বলবে, দেখা নয়।
কোনো তাড়াহুড়ো নয়। শুধু ভালোবাসবে, পড়বে, অপেক্ষা করবে।
এভাবেই শুরু হয়—
নতুন এক অধ্যায়,
নতুন এক সম্পর্ক,
নতুন এক প্রেম,
যার ভিত্তি— আস্থা আর ত্যাগ।
🟩 অধ্যায় ৭: বিক্রমপুরে হঠাৎ আগমন, স্কুলে গিয়ে খোঁজ, ছোঁয়ার পেছনে ছেলেরা, স্বপ্নীলের প্রতিশোধ— ভালোবাসার রক্ষা
⸻
ছোঁয়া এখন থাকে বিক্রমপুরে তার নানীর বাড়িতে।
স্বপ্নীলের মন ব্যাকুল—
“সে কেমন আছে?”
“কেউ ওকে বিরক্ত করে?”
“সে কি আগের মতোই শুধু আমারই?”
স্বপ্নীল আর চুপ করে থাকতে পারল না।
একদিন সে তার এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল—
বিক্রমপুরের উদ্দেশ্যে।
সাথে নিয়ে গেল ফল, চকলেট, আর কিছু উপহার।
সরাসরি ছোঁয়ার বাড়িতে না গিয়ে সে এক কাজ করল—
আগেই গিয়ে ছোঁয়ার স্কুলে হাজির হল।
জিজ্ঞেস করতে লাগল —
“এই মেয়েটা কি কারো সাথে মিশে?”
“কোন ছেলে কি বেশি কথা বলে?”
“কারো সাথে কি দেখা করে?”
সত্যিই কিছু কথা কানে এল যা স্বপ্নীলকে বিচলিত করে তুলল—
কয়েকজন ছেলে ছোঁয়াকে দেখতে স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
কারো বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাবও গেছে!
স্বপ্নীলের মাথা গরম হয়ে গেল।
তারপর সে টাকা খরচ করে আশেপাশের কিছু ছেলেকে ‘বন্ধু’ বানাল।
কারা ছোঁয়াকে বিরক্ত করে— সব খোঁজ নিয়ে তাদেরকে ডেকে নিয়ে বলল:
— “আমার ভালোবাসাকে ছুঁতে গেলেই হাত ভাঙা যাবে।”
একদিন স্কুল শেষে গেটের সামনে দুইটা ছেলে দাঁড়িয়েছিল ছোঁয়ার পথ আটকাতে।
স্বপ্নীল এক বন্ধুকে নিয়ে সামনে গেল—
তাদের শাসিয়ে দিল—
আর একজনকে সবার সামনে গালে থাপ্পড় মেরে বলল—
“এখন থেকে ছোঁয়ার দিকে কেউ তাকাবি না।”
এরপর কী আশ্চর্য!
যারা আগে বিরক্ত করত, তারাই এখন স্বপ্নীলের ভক্ত।
কারণ সে শুধু একটা ছেলেই না— সে একজন প্রেমিক,
যে রক্ষা করে নিজের প্রেমকে।
🟩 **অধ্যায় ৮: এক রুমে আঙ্গুর খাওয়া, ছোঁয়ার মুখে প্রথমবার— “তুমি আমার সব”
আর… স্বপ্নীলের জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত — এক প্রতিশোধমূলক বিয়ে**
⸻
বিক্রমপুরে ছোঁয়ার ঘরে একদিন দুইজন একা।
ছোঁয়া স্বপ্নীলকে বলল—
— “ভাইয়া, আমি ভাত নিয়ে আসি?”
স্বপ্নীল একটু হাসল,
— “না, আঙ্গুর ফল আনো।”
ছোঁয়া চলে গেল। একটু পর এক থালা আঙ্গুর ফল নিয়ে ফিরে এলো।
সেই রুমে কেউ নেই, দরজা খোলা, কিন্তু নিঃশব্দে এক ভালোবাসার হাওয়া বইছে।
স্বপ্নীল একটা আঙ্গুর মুখে নিল,
চুষে চুষে খেয়ে ছোঁয়াকে দিল।
ছোঁয়া হেসে খেলো।
এটাই ছিল তাদের প্রথম শারীরিক ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত।
কোন স্পর্শ নয়, কোন অশ্লীলতা নয়,
শুধু একটি ফলের আদানপ্রদান —
আর দু’জন প্রেমিকের চোখে চোখ পড়ে যাওয়া।
সেই রাতে ছোঁয়া বলল—
— “ভাইয়া, আমি সবসময় চাই আপনার সাথেই থাকি।
আমার নিজের পরিবার নিয়ে আপনাকে ভাবতে চাই।
আপনি যদি কাউকে বিয়ে করেন, আমি বাঁচবো না…”
স্বপ্নীল বলল—
— “তুমি কি আমায় এতটাই ভালোবাসো?”
ছোঁয়া চুপচাপ রইল কিছুক্ষণ, তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল—
— “তুমি আমার সব।”
⸻
কিন্তু সুখ সবসময় থাকে না।
একদিন হঠাৎ ছোঁয়া ফোনে জানাল,
— “আমার পরিবার আমাকে বলেছে, মেট্রিক পরীক্ষার পর আমার বিয়ে দিবে।”
স্বপ্নীল থমকে গেল।
তার চোখে ভেসে উঠল সেই ছোঁয়া — যে এক বছর অপেক্ষা করেছিল,
যে ফোনে বলত —
“ভাইয়া, আমি বিয়ে করব না, আপনাকেই করব।”
স্বপ্নীল বলল,
— “তুমি যদি বিয়ে করো, তোমার বিয়ের ৫ দিন আগেই আমি বিয়ে করব।”
— “আপনি পারবেন?”
— “হ্যাঁ, তুমিই যদি পারো, আমি কেন পারব না?”
ছোঁয়া কাঁদতে লাগল।
— “তুমি কি আমাকে এতটাই ভুলে গেছো?”
স্বপ্নীল কিছু বলল না।
শুধু মনে মনে ভাবল—
তাকে কষ্ট দেব, তাকেও দেখাব আমি কেমন ব্যথা পাই।
⸻
৫ দিন আগে সে বিয়ে করল।
কিন্তু তা ছিল এক নিঃশব্দ প্রতিশোধ।
নিজের চোখের পানি কেউ দেখেনি।
স্ত্রী পাশে, আর তার চোখে ছোঁয়ার মুখ।
এমনই এক রাতে, হঠাৎ ফোন—
ছোঁয়া।
— “তুমি বিয়ে করেছো ভাইয়া?”
— “হ্যাঁ, তুমি তো বলেছিলে, ১৬ তারিখে বিয়ে। আমি করেছি ১১ তারিখে।”
ফোনের ওপাশে কান্না।
— “তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙলে…
যার জন্য আমি মেট্রিক শেষ করলাম, যার জন্য আমি অপেক্ষা করলাম — সে কি আমাকে এত সহজে ছেড়ে দিল?”
স্বপ্নীল এবার চিৎকার করে বলল—
— “তুই কি করেছিলি? ভুলে গেছিলি আমায়?
যার জন্য তুই শাড়ি সেলাই করতি, যার নামের উপর রুমাল লিখতি — তাকে ভুলে গেছিস?”
ছোঁয়া তখন কাঁদছিল, পাগলের মতো।
— “তুই জানিস না, আমি কিভাবে অভিনয় করছিলাম!
আমি তো বিয়ে করিনি! শুধু তোর ভালোবাসা যাচাই করছিলাম!”
⸻
স্বপ্নীল তখন বুঝতে পারল—
সে এক ভুল করে ফেলেছে।
এক অপূরণীয় ভুল।
একটি ভালোবাসার গল্প,
একটি বিশ্বাসের পরীক্ষা,
আর একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
🟩 অধ্যায় ৯: ছোঁয়ার কান্না, স্বপ্নীলের স্ত্রীর সন্দেহ, আর ভালোবাসা ও বাস্তবতার মধ্যকার অমোচনীয় দূরত্ব
বিয়ের পর স্বপ্নীলের সংসার চলতে থাকে ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর সবকিছু যেন জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
একদিন হঠাৎ স্বপ্নীলের ফোনে আবার একটি কল।
— “ভাইয়া…”
এই কণ্ঠ স্বপ্নীল চিনতে ভুল করল না।
ছোঁয়া।
— “তুমি এখন কী করছো?”
— “সংসার করছি,” নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল স্বপ্নীল।
ছোঁয়া চুপ। ফোনের ওপাশ থেকে শুধু শোনা যাচ্ছিল দম বন্ধ করে কান্না চাপার চেষ্টা।
স্বপ্নীল বলল,
— “তুমি আমাকে কি এতটাই বোঝো না?
তুমি তো বলেছিলে ভালোবাসো, তাহলে ভুল বোঝালে কেন?”
ছোঁয়া তখন বলল —
— “আমি তো অভিনয় করেছিলাম, ভাইয়া। আমি বিয়ে করিনি, কাউকে ভালোবাসিও না।
তোমাকে পরীক্ষা নিয়েছিলাম, বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম তুমি আসলে কতটা ভালোবাসো…”
স্বপ্নীল হতবাক। সে এতটা বড় ভুল করল!
একটি ভালোবাসার পরীক্ষায় সে অকৃতকার্য।
তার চোখে জল, কিন্তু এখন কিছুই করার নেই।
সংসার চলছে। চারপাশে হাসিমুখ, আত্মীয়-স্বজন।
এই হাসির পেছনে স্বপ্নীলের বুক ফাটানো কান্না কেউ দেখতে পায় না।
⸻
এদিকে ছোঁয়া…
ছোঁয়া দিনের পর দিন কাঁদছে।
স্বপ্নীলের কথা মনে পড়লেই শুধু একটাই কথা বলে—
“এই বেইমানের নাম নিও না আমার সামনে।
সে আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে।”
ছোঁয়ার বিয়ে আর হচ্ছিল না।
যেখানেই প্রস্তাব আসে, সেখানেই সে না করে দেয়।
তার নানীর বাড়ি, বিক্রমপুর — সেখানেই সে থেকেছে।
মাঝেমধ্যে স্বপ্নীলের ফোন আসে, ছোঁয়া রিসিভ করে না।
একদিন স্বপ্নীলের স্ত্রী ফোনে দেখে কারো নাম নেই, শুধু “Unknown”।
জিজ্ঞেস করে—
— “এই মেয়েটা কে? বারবার ফোন করে?”
স্বপ্নীল কিছু বলে না।
কিছুদিন পর স্বপ্নীলের মা নিজেই ফোন করে ছোঁয়াকে—
— “মা, আমার ছেলে তোকে অনেক ভালোবাসতো। তোর জন্য পাগল ছিল।
তুই এখন আর তাকে ফোন করিস না, প্লিজ। সে এখন সংসার করছে।
তার ঘর যেন ভেঙ্গে না যায়। প্লিজ মা, আর ফোন করিস না।”
এই কথাগুলো শুনে ছোঁয়া নীরব।
ফোন রেখে দেয়।
আর কখনও ফোন করে না।
⸻
🟩 অধ্যায় ১০: দুটো জীবন, দুই দিকের দুটি চোখের পানি
দিন চলে যায়।
একটা বছর… দুটো… তিনটে…
স্বপ্নীল এখন সংসার করে।
ছেলে হয়েছে, মেয়ে হয়েছে — তবু একটা ছবি মনে পড়ে…
ছোঁয়া পুকুর ঘাটে বসে আছে, হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে বলছে,
“ভাইয়া, আমি আপনাকে ছাড়া কিছুই না…”
এই কথা আজও স্বপ্নীলকে ঘুমাতে দেয় না।
ছোঁয়া আজও বিয়ে করেনি।
জানে সবাই বলবে —
“এই মেয়ে তো একটা ছেলেকে ভালোবেসে ভুল করে ফেলেছিল।”
কিন্তু সে নিজের ভিতর সেই ভুল করা ভালোবাসাটাকেই আগলে রেখেছে।
শুধু চোখের জল ঝরিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেছে বারবার।
⸻
🟩 শেষ অধ্যায়: একটি অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা
স্বপ্নীল একদিন খুব অসুস্থ হয়।
হাসপাতালে শুয়ে, চোখে পানি।
তার স্ত্রী পাশে, সন্তান পাশে — তবু বুকের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা।
হয়তো এই জায়গাটা…
কোনদিন পূরণ হবে না।
কারণ সেখানে ছিল…
“ছোঁয়া।”
⸻
❖ শেষ লাইন:
ভালোবাসা কখনও ভুল হয় না।
ভুল হয় — ভালোবাসার মানুষকে সময়ে না বুঝে ফেলা।